“বইমেলার পথিক”
ফেব্রুয়ারির নরম রোদে ধুলো উড়ে যায়,
শহরজুড়ে বাংলা ভাষা কাঁধে পতাকা চায়।
গেটের কাছে মানুষের ঢেউ, বইয়ের গন্ধ ভাসে,
সে হারিয়ে যায় শব্দেদের রঙিন ভিড়ের পাশে।
কাঁধে তার পুরোনো ঝোলা, চোখে কৌতূহল,
প্রতিটা stall যেন ডাকে—
“এসো, বসো চল।”
নতুন মলাট চকচকে সব, অক্ষরে অক্ষরে নেশা,
পাতা উল্টালেই বুকের ভেতর বেজে ওঠে দেশা।
কোথাও কবিতা, কোথাও প্রেম, কোথাও ইতিহাস,
কোথাও একাত্তরের গল্পে ভিজে ওঠে নিশ্বাস।
কোনো লেখক autograph দেন মাথা নত করে,
কেউবা শুধু চুপটি বসে পাঠকের চোখ পড়ে।
সে বই কেনে হিসাব ছাড়া—
পকেট যদিও ফাঁকা,
তবু বইয়ের কাছে হেরে যাওয়া তার পুরোনো অভ্যাস-ঢাকা।
বন্ধুরা বলে—
“PDF আছে, এত টাকার মানে কী?”
সে হেসে বলে—
“নতুন বইয়ের গন্ধ download হয় নাকি?”
প্রথম পাতায় নাম লিখে রাখে নীল কালিতে ধীরে,
যেন কোনো গোপন প্রেম জমে আছে নীরবে।
কখনো এক কোণে বসে পড়ে জীবনানন্দ চুপে,
কখনো হারায় শিশুতোষে শৈশবেরই রূপে।
চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে সন্ধ্যার আলোর নিচে,
মাইকে ভেসে কবিতা আসে ভাঙা ভাঙা পিছু পিছে।
তার মনে হয়—
এই মেলাটা শুধু বইয়ের নয়,
এ যেন হাজার মানুষের একসাথে বেঁচে রই।
সে হাঁটে stall থেকে stall—
সময় থামে না তবু,
বুকশেলফে সাজানো স্বপ্ন ডাকে নীরব কভু।
কোথাও প্রেমিকার হাত ধরা, কোথাও শিশুর হাসি,
কোথাও বৃদ্ধ মানুষ একা পুরোনো স্মৃতি বাঁশি।
তারও ছিল কেউ একদিন—
বইমেলায় আসত সাথে,
কবিতার বই কিনে বলত—
“লিখবে আমায় রাতে?”
এখন শুধু ভিড়ের মাঝে একা হাঁটা পথ,
তবু ফেব্রুয়ারি এলেই জেগে ওঠে রথ।
সে ভাবে—
“মানুষ মরে, ভাষা থাকে, বইগুলোও বাঁচে,
একটা কবিতা শত বছর কারও বুকেই নাচে।”
তাই সে আবার বই কিনে,
আবার ভরে ব্যাগ,
বাসায় গিয়ে না খেয়ে হলেও বই রাখে আগল লাগ।
রাত গভীরে টেবিল ল্যাম্পে পাতাগুলো খোলে,
অক্ষরগুলো নদীর মতো ঘুমের দেশে দোলে।
একটা লাইনে থমকে গিয়ে চোখটা ভিজে যায়,
কোন লেখক কীভাবে যেন মনের খবর পায়!
বাইরে তখন শহর ঘুমায়, জানালায় চাঁদ ঝরে,
সে বুকের কাছে বইটা টেনে ফিসফিসিয়ে পড়ে।
হঠাৎ ভেতর থেকে খসে পড়ল হলুদ কাগজ এক—
বইয়ের মাঝখানে রাখা আছে
দশ বছর আগের
তার বাবার হাতের লেখা bookmark।
তাতে শুধু লেখা—
“বই কিনিস।
মানুষ একদিন ফুরিয়ে যায়,
পড়ে থাকা শব্দগুলো যায় না।”
No comments:
Post a Comment